এনিভার্সারী গিফ্ট

সোনালী সৌহাদ্য

0

ছোট বোনের বিয়ের পর একদিন বাপের বাড়ি বরকে নিয়ে বেড়াতে এসেছি, আসলে ঠিক বেড়াতে নয়, বাবা ফোন করে জানালেন যে তোমাদের সকলকে নিয়ে আজ একটি পারিবারিক মিটিং করবো। সুতরাং তোমরা সবাই সময় মতো চলে এসো। আজ এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে যে বাবা ঘটা করে আমাদের সব ভাইবোনকে এক সাথে ডেকেছেন। দুই ভাই, ভাই এর বৌ এবং তাদের বাচ্চারা বাবা- মায়ের সাথেই এ বাড়িতে থাকে।

দুপুরে সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করে বিকেলে বাবার কথা মতো সবাই ড্রইংরুমে এসে বসলাম। বাবা কিছুক্ষন পর আসলেন এবং মাকে পাশে নিয়ে বসলেন। খুব টেনশন হচ্ছে বাবা ঠিক কি করতে চলেছেন।

হঠাৎ বাবা বলতে শুরু করলেন। শোন, তোমরা আমার সন্তান, জ্ঞান হবার পর থেকে হয়তো আমাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জেনে এসেছো। আমিও চেষ্টা করেছি একজন আদর্শ বাবা হবার আর হয়তো কিছুটা পেরেছি যার ফলাফল আজ আমার প্রতিটি সন্তান সুসন্তান, উচ্চশিক্ষিত এবং যে যার মতো প্রতিষ্ঠিত। সবার ছোট ঝিমলি, তোমাকেও বিয়ে দিয়ে দিলাম ঘর, বর সব ভালো দেখে, মৈনাকের বৌ এলো তাও প্রায় ৯ বছর পার হয়ে গেছে। সন্তানদের প্রতি এইটুকু দায়িত্ব অন্ততঃ পালন করেছি। তবে আমি স্বামী হিসেবে মোটেও সফল নই বরং বিপরীতটাই বলতে পারো।

বাবার কথা শুনে বাবাকে এবার থামানোর চেষ্টা করছেন মা কিন্তু বাবা মাকে বাধা দিয়ে বললেন, আজ আমাকে থামাতে চেয়ে কোনও লাভ হবে না গীতা। স্বামী হিসেবে বেলা শেষে হলেও অন্ততঃ এখন আমি আমার দায়িত্ব কিছুটা পালন করতে চাই, আমি আমার সন্তানদের কাছে নিজের অন্যায় স্বীকার করতে চাই। আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না, বাবা ঠিক কি বলতে চাইছেন। আমরা বারে বারে সবাই একে অপরের মুখের দিকে চাইছি আর ভাবছি এবার কি হবে?

বাবা আবারও বলতে শুরু করলেন, আমি ছিলাম ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয় আর লেখা পড়ায় ভালো. আমি যখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি গেলাম তখন আমার বাবা তার এক বন্ধুর মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেন। আমার নিজের যদিও কোনও পছন্দ ছিল না কিন্তু মনে মনে ভাবতাম, আমি যাকে বিয়ে করবো সে খুব সুন্দরী হবে আর গায়ের রং টা ফর্সা হতেই হবে।

কিন্তু মেয়ে দেখতে গিয়ে দেখলাম মেয়ে মোটেও ফর্সা নয় বরং তার উল্টো। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় আর প্রচন্ড রাগ হয় আমার বাবার প্রতি কিন্তু বাবা অত্যন্ত রাগী ছিলেন তাই খুব ভয় পেতাম বাবাকে আর সেই ভয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু বলতে পারিনি।

এক সপ্তাহ বাদে আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। তবে বিয়ে হলেও আমি সেই স্ত্রীকে মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। সে বিভিন্ন ভাবে আমাকে খুশি করার চেষ্টা করতো কিন্তু আমি তাকে আমার সামনে দেখলেই বিরক্ত হতাম। অবশেষে আবার কোলকাতায় ফিরে এলাম আর একটা সরকারি চাকরিতে জয়েন করলাম। ভুল করেও স্ত্রীর কথা মনে হতো না আমার।

আর এবার যেটা বলবো সেটা চরম লজ্জার তবুও আমি বলবো, নিজের পাপ স্বীকার আমি নিজের সন্তানদের কাছেও করবো, এই বলে বাবা আবার বলা শুরু করলো, চাকরি পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কোলকাতায় আমি যে বাড়িতে ভাড়া থাকি সেই বাড়ির মেয়েকে ভালো লাগতে শুরু করে কারণ সেই মেয়ে খুব সুন্দরী। আমি এই ছয় মাসে একবারও গ্রামে যাইনি।

সেই মেয়ের সাথে প্রায় প্রতিদিন বাড়ির ছাদে কথা হতো এমনকি মনে মনে ভেবেও ফেলি কাউকে না জানিয়ে সেই মেয়েকে বিয়ে করে নেবো। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনি সেই মেয়ের হাসবেন্ড বিদেশ থেকে এসেছেন অথচ ওই মেয়ে এতদিন আমাকে একবারও বলেনি যে সে বিবাহিতা ।

প্রচন্ড মানসিক কস্ট নিয়ে গ্রামে ফিরলাম কিন্তু নিজ স্ত্রীকে কোনোরকম সন্মান তো দিইনি বরং সামনে এলে মাঝেমাঝে দূরদূর করতাম আর সেই সুযোগটা আমার মা, বাড়ির অন্য বৌরা নিতো। বাড়ির দাদু, দিদাসহ বার, তের জনের কাঠের উনুনে রান্না, সাথে বাড়ির যাবতীয় কাজ সব গীতাকে দিয়েই করানো হতো। আমি দু’একবার আড় চোখে খেয়াল করতাম ওর হাতে ফোস্কা পরে থাকতো পাটায় মশলা পেশার কারণে। সেই কাকডাকা ভোরে উঠে বাড়ি, উঠোন ঝাড়ু দেয়া থেকে সবার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেওয়া যেন ওর নিত্যদিনকার রুটিন ছিল। তাতেও শান্তি ছিল না, পান থেকে চুন খসলেই ওকে সবাই বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতো। বাড়িতে ওকে কেবল আমার বাবা ভালোবাসতেন।

যাই হোক, আমি কোলকাতায় ফিরে আসি তারপর আর বাড়ি যাবার নাম পর্যন্ত করি না। বাবা চিঠি পাঠালে কোনো রকম জবাব দিই। এভাবে হঠাৎ একদিন বাবার চিঠিতে জানতে পারলাম আমার একটা কন্যা জন্ম হয়েছে আর কন্যাটি দেখতে নাকি আমার মতোই। যাক আমার সন্তান অন্তত তার মায়ের মতো কালো তো হয়নি! আমি গ্রামে আসি। এভাবে একে একে আমার আরও দুটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। ততদিনে অবশ্য আগের মতো গীতাকে অপমান না করলেও খুব যে ভালোবাসতাম সেটাও নয়।

এর মধ্যে হঠাৎ একবার একসিডেন্ট হয়ে আমার বাম পায়ের হাটু ভেঙে যায়। অনেকদিন কোলকাতায় ট্রিটমেন্টে করার পর আমাকে গ্রামে নিয়ে আসে। সে সময় গীতা আমাকে যেভাবে সেবা করে, ডাক্তার দেখানো, নিয়ম করে ব্যায়াম করানো, টাইম মতো ওষুধ দেওয়া। আমাকে সুস্থ করে তোলে তাও পুরো সংসারের দায়িত্ব পালন করার পর। আমি সেইসময় অবাক হয়ে ভাবি এ আমি কাকে পেলাম জীবনে! সুন্দর চেহারাই কি সব! রত্ন চিনতে এতো সময় লাগলো আমার!

একটা সুন্দর মন পারে পুরো পৃথিবী আনন্দে ভরিয়ে দিতে। সেই প্রথম বিয়ের ১৯ বছর পর আমার চোখে ধরা পরলো পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী রমণী তোমাদের মা। একদিন আমার অন্য ভাইয়ের বৌরা গীতাকে কাজের হুকুম করে, তখন আমি বাধা দিয়ে চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে বলি, কেন আমার স্ত্রী সব কাজ করবে! অন্যদের মতো ও এই বাড়ির বৌ। ওকে ওর যোগ্য সন্মান সবাইকে দিতে হবে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওকে আমি ১৯টি বছর ধরে এতো অপমান করেছি, কস্ট দিয়েছি অথচ আমার সামনে তাকে কাঁদতে দেখিনি কখনও, হয়তো ভয়ে, হয়তো লুকিয়ে কেঁদেছে। কিন্তু সেদিন গীতা চিৎকার করে কেঁদেছে আর বলেছে, তার জীবনে যা চাওয়ার ছিল তা সে পেয়ে গেছে। কারণ তার স্বামী তাকে সকলের সামনে নিজের স্ত্রী বলে সন্মান দিয়েছে। সেদিন আমিও খুব কেঁদেছি। এমন একটা মেয়েকে আমি এতগুলো বছর এতো কস্ট দিয়েছি।

ছয় মাস পর আমি আবার কোলকাতায় ফিরে নতুন চাকরিতে জয়েন করি এবং ঠিক করি গীতাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। কিন্তু বাঁধ সাধেন আমার মা। তিনি কিছুতেই ওকে আসতে দিলেন না। ও চলে এলে এতবড় সংসার সামলাবে কে! বাড়িতে দাদা, দাদী, শ্বশুর, শ্বাশুড়ির সেবা করবে কে?

এভাবে কেটে গেল আরও কয়েকটি বছর তবে তখন নিয়ম করে কদিন পর পর গ্রামে যেতাম আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী রমণীকে দেখার তাগিদে। এর মধ্যে অবশ্য আমাদের ছোট মেয়ের জন্ম হয়। তিতলি, আমার বড় সন্তান তখন ক্লাশ নাইনে উঠেছে। মেয়েটি আমার খুব দ্রুত লম্বা আর সুন্দরী হয়ে যাওয়ায় গ্রামে রাখা বিপদজনক হয়ে ওঠে আর এটাকেই একটা সুযোগ বানিয়ে সেবার বাড়িতে রীতিমতো ঝগড়া করেই তোমাদেরসহ তোমাদের মাকে নিয়ে কোলকাতায় চলে আসি, আর সেদিনও আমাকে পূর্ণ সাপোর্ট দেন আমার বাবা যার নয়নের মনি ছিল তোমাদের মা।

চার সন্তানের লেখাপড়া, সংসার খরচ, বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে, কিছু টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। তাই যৌবনকালে তোমাদের মাকে কোনওদিন ভালো একটা শাড়ি পর্যন্ত দিতে পারিনি। তারপরও কোনোদিন কোনও অভিযোগ করেনি তোমার মা।

বাবার মুখে মায়ের কষ্টের কথাগুলো শুনে আমরা সবাই কাঁদছি। এতবছরে একটি বারের জন্যও মা কোনওদিন এসব কথা আমাদের বলেননি।

বাবা আবার বলা শুরু করলেন, বড় বৌমা, ছোট বৌমা, আমি তোমাদের দোষ দিচ্ছি না। তোমাদের অধিকার আছে স্বাধীনভাবে বাঁচার তেমনি তোমাদের শাশুড়ি মায়েরও। ও এখনও বাড়ির সবার রান্না করে আর তোমরা সবাই যে যার ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যাস্ত। ছুটির দিনেও তোমরা নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াও আর তোমাদের শাশুড়ি সেই ঘরের কোনে বসে থাকে।

কিন্তু তারপরও বুঝতে পারি তোমরা বিরক্ত হও শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে নিয়ে সংসার করতে। তাই আমি চাই তোমরা আলাদা আলাদা বাড়ি নাও কারণ সেই এবিলিটি তোমাদের আছে আর সেটার চাইতেও বড় কথা, এই বয়সে এসে আবার গীতাকে তোমাদের হুকুম মানতে হবে, সেটা তো আমি মেনে নেবো না কিছুতেই। এ বাড়িতে আমি আর তোমাদের শাশুড়ি মা থাকবো।

খুব অল্প টাকায় জমিটা কিনে রেখেছিলাম আর সেই টাকাটা ছিল তোমাদের মায়ের তার বাবার বাড়ির দেয়া বিয়ের গয়না বিক্রির টাকা আর আমাদের জমানো সামান্য কিছু টাকা। অবসর নেওয়ার পর যে টাকাটা পেয়েছিলাম সেটা দিয়ে তিনতলা বাড়িটা করলাম। বাড়ি ভাড়া বাবদ যে টাকাটা আসবে সেটা আমাদের দুজনের জন্য ঢের।

তোমাদের মাকে নিয়ে আমি তেমন ভাবেই থাকবো যেমনটা এ যুগের হাজবেন্ড ওয়াইফরা থাকে। তাকে নিয়ে রোজ ঘুরতে যাবো। শহর ঘুরাবো, সম্ভব হলে দেশের বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবো আমার যতটুকু সামর্থ আছে তাঁর মধ্যেই। আমাদের প্রতি তোমাদের ফিন্যান্সিয়াল কোনও সাপোর্ট দিতে হবে না। শুধু মাসে অন্তত একটা রবিবার এ বাড়িতে সবাই মিলে এসে আমাদের সাথে কাটিয়ে যাবে। সেটাও যদি না পারো তাতেও আক্ষেপ থাকবে না। ভেবে নিবো আমার সন্তানরা বিদেশে থাকে, তাই চাইলেই দেখা করা সম্ভব নয়।

আমি এখন থেকে ঘরের কোনও কাজ গীতাকে করতে দেব না। কাজের মেয়ে থাকবে সেই সব কাজ করবে। আমরা জীবনের এই শেষ বেলাতে অন্তত একটু ভালো সময় কাটাবো নিজেদের মতো করে।

সব শুনে মা বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেন। ভাইরাও বাধা দিতে চাইলো। কিন্তু বাবা যেন এবার স্বার্থপর হয়ে গেলেন নিজের স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা নিজের মতো থাকার জন্য।আর মা বাধা দিলেও তার চোখ, মুখে কেমন স্বচ্ছ আলো যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অনেক বছরের না পাওয়া যেন এক নিমিশেই পেয়ে গেলেন।

বাবা আবার বলতে শুরু করলেন, তোমাদের মাকে আমি যেদিন দেখতে যাই আজ হলো সেই বিশেষ দিন, আর তাই আমি তোমাদের মাকে নিয়ে আজ রেস্টুরেন্টে ডিনার করবো। এই কথা শুনে মা যেন লজ্জায় তাকাতে পারছেন না কারও দিকে। শুধু মাথা নীচু করে বলছেন, দোহাই তোমায় এই বয়সে এসব কিছু করতে যেও না, মানুষ হাসবে, টিটকারি দেবে।

বাবা বললেন, যে হাসার সে হাসবে। হাসলে হার্ট ভালো থাকে। তোমার আমার কারণে না হয় কিছু মানুষের হার্ট একটু পাকাপোক্ত হলো। বাবার কথায় এবার আমরা কেউ হাসি আটকে রাখতে পারলাম না।

বাবা আবার বললেন, ঠিক এক সপ্তাহ পর আমাদের এনিভার্সারী আর জীবনে এই প্রথমবার আমি আমাদের এনিভার্সারী পালন করব তাও খুব ঘটা করে। তোমাদের কিছুই করতে হবে না শুধু ঐদিন প্রত্যেকে খুব ছোট্ট করে হলেও আমার গীতার জন্য এনিভার্সারী গিফ্ট নিয়ে এসো। বলেই বাবা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করলেন সাথে মাও। তবে এই কান্না আনন্দের, এই কান্না সুখ প্রাপ্তির, এই কান্না বহুদিনের না পাওয়ার কান্না।

যার শেষ ভালো তার সব ভালো

সুজা/০৯/২৪

Leave A Reply

Your email address will not be published.