বাংলাদেশে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ

সুহৃদ জাহাঙ্গীর

1

ওভার দ্য টপ, যার সংক্ষিপ্ত নাম ওটিটি। ওটিটি হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে দর্শকদের সরাসরি সেবা দেওয়ার একটি মাধ্যম। ক্যাবল সম্প্রচার কিংবা স্যাটেলাইট টেলিভিশন প্ল্যাটফর্মগুলোকে পাশ কাটিয়ে যা পরিবেশক হিসেবে কাজ করে। সোজা কথায়, ওটিটি টেলিভিশন বা সিনেমা হলের মতো মাধ্যমগুলোকে পাশ কাটিয়ে দর্শকের কাছে সরাসরি সেবা নিয়ে যায়। এজন্য দর্শককে একটি প্ল্যাটফর্মের গ্রাহক হতে হয়। যেখানে বিজ্ঞাপন ছাড়াই পছন্দের কনটেন্টটি দেখা যায়।

বর্তমান বিশ্বে ওটিটি প্লাটফর্ম দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে দর্শক ঘরে বসে সহজেই অনলাইনে বিনোদন উপভোগ করতে পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, এইচবিও ম্যাক্স, ডিজনি প্লাস, হটস্টার ইত্যাদি। আমাদের দেশে জনপ্রিয় ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়োস্কোপ, চরকি, বিঞ্জ, সিনেবাজ ইত্যাদি। এছাড়া ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই ও জিফাইভ বাংলাদেশের জন্য আলাদাভাবে কনটেন্ট নির্মাণ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী ওটিটি প্লাটফর্মে দর্শক সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে করোনাকালে এই সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বলা যায়, মহামারী ওটিটি প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নেটফ্লিক্স ও অন্যান্য ওটিটি প্লাটফর্ম কোভিড-১৯ চলাকালে বিনোদনের একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছিল। জরিপে দেখা গিয়েছে, ২০২০ সালে মাত্র তিন মাসে যুক্তরাজ্যে ১৭ লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছে ওটিটি প্লাটর্ফমের সঙ্গে। ওয়েব পোর্টাল ম্যাজসিস্টেমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ওটিটির বাজারমূল্য হবে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। বিনোদনের এ মাধ্যম এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর এজন্যই ভবিষ্যতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হবে ওটিটিকে। শুধু সে জন্যই দর্শক চাহিদা পূরণে সময়োপযোগী ও মানসম্পন্ন কনটেন্ট তৈরিতে জোর দিতে হবে এই মাধ্যমটিকে।

তারপরও ভবিষ্যতে ওটিটি এগিয়ে যাবে বলেই মনে করেন অনেকে। এখনকার দর্শকরা খুবই সচেতন, তারা এখন মানসম্পন্ন কনটেন্ট দেখতে চায়। টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত ভালো কনটেন্ট তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন নির্মাতারাও। যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওটিটি এগিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও বিনোদনমাধ্যমে পরিণত হবে বলে অনেকেই মনে করেন।  এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রী ও নির্মাতা রোকেয়া প্রাচী বলেন, ‘ওটিটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি শিল্প মাধ্যম। ভবিষ্যতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের নির্মাণ ও প্রদর্শনে নেতৃত্ব দেবে। সেজন্য ওটিটির জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রের সেন্সরশিপের বিষয়টিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমাদের ওটিটিকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে বাংলাদেশের কনটেন্ট আগামীর বিশ্বে নেতৃত্ব দিবে।’

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, ‘ওটিটি একটি বিনোদন মাধ্যম। এর মূল বিষয় হচ্ছে চলচ্চিত্র, সেটি কোথায় প্রদর্শিত হলো এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। চরকি শুধু ওটিটি প্ল্যাটফর্মই নয়, এটি লগ্নিকারক অর্থাৎ প্রযোজক হিসেবেও বাংলা চলচ্চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত ১ বছরের প্রতি মাসে ১টি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন করে আসছে এই প্ল্যাটফর্মটি। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক কিছু স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এ রকম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ওটিটির জন্য নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারকে দৃষ্টি রাখতে হবে। নীতিমালা যেন বৈশ্বিক বিবেচনায় আধুনিকিকরণ করা হয়। কারণ, এই ওটিটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের মানুষ উপভোগ করতে পারে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা রায়হান রাফী বলেন, ‘কোভিড-১৯ এর সময় ওটিটি দর্শক তৈরি করেছে। বর্তমানে সিনেমা হলে যত দর্শক আসছেন, তারা সবাই ওটিটিতে কনটেন্ট দেখা মানুষ। ওটিটি ঘিরে নতুন নতুন নির্মাতা নিত্য নতুন কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। সেকেলে কোনো নীতিমালা দিয়ে এটাকে যেন বাধাগ্রস্ত না করা হয়। বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো দর্শক ধরে রাখা এবং নতুন দর্শক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণেই কোভিডের পর দল বেধে দর্শক ‘হাওয়া’ এবং ‘পরাণ’–এর মতো সিনেমা দেখতে গেছেন। অন্যদিকে টেলিভিশন নাটক প্রচারের ক্ষেত্রে সেন্সর নীতি নেই। কারণ, টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রিভিউ কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই নাটকগুলো প্রচার করেন। ওটিটির ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষ সে রকম কোনো ব্যবস্থা রাখলে ভালো হয়। সরকারি কোনো কঠোর নীতিমালা ওটিটির ওপর চাপিয়ে দিলে নতুন এই মাধ্যম, এমনকি চলচ্চিত্র হুমকির মুখে পড়বে। অভিনেতা মিশু সাব্বির বলেন, ‘আমাদের দেশে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুরো এখনো অনেক ছোট আকারে আছে। তবে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো বাধাগ্রস্থ না হলে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ওটিটি’র জোয়ার আসবে।’ শুধু মিশু না অনেক খ্যাতিমান তারাকা ও নির্মাতাও এটাই মনে করছেন।

বাংলাদেশে সৃষ্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে নিঃসন্দেহে। তবে এ জনপ্রিয়তা কত দিন ধরে রাখতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। এ জন্য উচিৎ নির্মাতা যেন দেশিয় দর্শকের রুচি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে সময়োপযোগি মানসম্পন্ন কনটেন্ট নির্মাণ করা। তাতে শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের নাম। তৈরি করে নিবে নিজের অবস্থান।

 

সুজা/০৯/২৪

1 Comment
  1. রোকেয়া বেগম says

    অনেক কিছু জানা গেল।

Leave A Reply

Your email address will not be published.